বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৭ অপরাহ্ন
জামাল হোসেন লিটন, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ): হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় পাহাড়ি ঢল ও পানির প্রবল স্রোতে অবিরাম ভাঙছে সংরক্ষিত পাহাড়-টিলা ও চা বাগানের উঁচু ভূমি। প্রতিবছরই ভাঙনের কবলে পড়ে নদী-ছড়ায় বিলীন হচ্ছে পাহাড়ের পাড় ও চা বাগানের টিলা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চা বাগান, সড়ক, সেতু ও জনবসতি। ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও বসতবাড়ি ও ফুটব্রিজও বিলীন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চললেও ভাঙন রোধে কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড় ও চা বাগানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ছোট-বড় ছড়াগুলো দীর্ঘদিন ধরে বালু ও পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে না। অল্প সময়েই পানির তীব্র স্রোত সৃষ্টি হয়ে ছড়ার পাড় ও পাহাড়ি টিলা ভেঙে নিয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ছে চা বাগান, যোগাযোগব্যবস্থা, সেতু ও আশপাশের বসতবাড়িতে।
ইতোমধ্যে উপজেলার সাতছড়ি টিপড়া আদিবাসী পল্লি, রামগঙ্গা সেতু, চা বাগানের বিভিন্ন সেতু এবং ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙনের শিকার হয়েছে। কোথাও কোথাও বড় বড় টিলা ধসে ছড়ায় মিশে গেছে।
সুরমা চা বাগানের টিংকু সাঁওতাল বলেন, “এ বছর পাহাড়ি ঢলে ২০ নম্বর নির্মাণাধীন সেতুর সংযোগ সড়কের মাটি পানির স্রোতে ধসে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কিবরিয়াবাদ সেকশনে বড় বড় টিলা ভেঙে ছড়ায় মিশে গেছে। সরকার বা বাগান কর্তৃপক্ষ—কেউই এগুলো রোধে এগিয়ে আসছে না। ছড়াগুলো খনন করে গাছ লাগানো হলে মাটি ধস অনেকটা রোধ করা সম্ভব।”
সাতছড়ি টিপড়া আদিবাসী পল্লির হেডম্যান চিত্ররঞ্জন দেববর্মা বলেন, ছড়া খনন না করায় টিপড়া বস্তির পাঁচটি বসতবাড়ি ছড়ায় বিলীন হয়ে গেছে। একটি ছোট ফুটব্রিজও পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। ছড়ায় বালু জমে পানির ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় পাহাড় ও ছড়ার পাড় ভেঙে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। পরিকল্পিত ব্যবস্থা না নিলে প্রতিবছরই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হবে।
চাকলাপুঞ্জি চা বাগানের অমর ভূমিজ বলেন, “চাকলাপুঞ্জি ও রামগঙ্গার ভাঙন দেখলে আমাদের ভয় লাগে। প্রতিবছর চা বাগানের বড় বড় টিলা ভেঙে যাচ্ছে। এবার ভাঙনে পুরাতন রামগঙ্গা মহাসড়কেরও ক্ষতি হয়েছে। কিছু অংশে পাকা করা হলেও অনেক জায়গা এখনো ভাঙা অবস্থায় রয়েছে।”
চন্ডিছড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক সেলিমুর রহমান বলেন, চা বাগানের বিশাল এলাকাজুড়ে টিলা ভাঙছে। ছড়া খনন করে পানির স্রোত নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পাহাড় ও চা বাগানের ভাঙন অনেকটা রোধ করা সম্ভব। বর্তমানে ভাঙনের তীব্রতা অনেক বেশি। এতে চা গাছ, সেতু, সড়ক ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নেটওয়ার্ক সদস্য ওমাইয়া ফেরদৌস বলেন, পাহাড় ও চা বাগানের টিলা ভেঙে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষতি রোধে সরকারকে টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় পাহাড়ি এলাকা ও চা বাগানের টিলাগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাবে।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ বলেন, প্রতিবছরই পাহাড় ও নদীভাঙনের ঘটনা ঘটছে। এ বছরও অনেক পাহাড়ি টিলা, চা বাগান ও সেতু ধসে গেছে। কিছু জায়গায় মেরামত করা হয়েছে। কীভাবে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ করা যায়, সে বিষয়ে কারিগরি দিক বিবেচনা করা হচ্ছে।