শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১১:৩২ অপরাহ্ন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: মহাজোট নিয়ে জামাই-শ্বশুরের টানাটানি

সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন নিয়ে জামাই-শ্বশুরের এই টানাটানিতে বিভ্রান্ত আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট শরিক অন্যান্য দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

এরমধ্যে সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে আছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মঈন উদ্দিন। মহাজোটের প্রার্থী নিয়ে জামাই-শ্বশুরের ‘দ্বন্দ্বে’ আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ তার দলে ভিড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এদিকে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধী মহাজোটের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে এই আসনে ভোটের লড়াইয়ে আছেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা উকিল আব্দুস সাত্তার ভূইয়া। এই আসন থেকে দুইবার সাংসদ নির্বাচিত সাত্তার ভূইয়া বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে প্রতিমন্ত্রীও হয়েছিলেন।

আগে থেকে এলাকায় তার প্রভাব থাকায় মহাজোটের প্রার্থী জটে ভোটে তারই লাভ হবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা।

তাদের একজন মোহাম্মদ আলফাজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এভাবে যদি দুই জন মহাজোটের প্রচারণা চালান এবং এখানে যেহেতু নৌকার কোনো প্রার্থী নেই, তাই ধানের শীষ এখানে বড় একটা সুযোগ করে নেবে।”

জামাই-শ্বশুরের দ্বন্দ্ব

জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান জিয়াউল হক মৃধা ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এক আওয়ামী লীগ নেত্রীকে হারিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি।

এবারও দলীয় মনোনয়নের জন্য শুরু থেকেই দৌড়ঝাঁপ করছিলেন তিনি। এরমধ্যে দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া দলের মনোনয়ন বাগিয়ে নেন।

জাতীয় পার্টির তৎকালীন মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের স্বাক্ষরসহ প্রত্যয়ন নিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করায় লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ পান তিনি। অপরদিকে জিয়াউল হক মৃধা সে সময় দলীয় প্রত্যয়ন না থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

১০ ডিসেম্বর তিনিও লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ চেয়েছিলেন, কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তা দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন দেখতে চাইলে ব্যর্থ হন। তখন সিংহ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয় তাকে।

এরমধ্যে ঋণ খেলাপের দায়ে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পরে দলের মহাসচিবের পদ হারান রুহুল আমিন হাওলাদার। তার জায়গায় আনা হয় দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মশিউর রহমান রাঙ্গাঁকে।

দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই রদবদলে কপাল খোলে জিয়াউল হক মৃধার, দলের চূড়ান্ত মনোনয়নের কাগজ নিয়ে তিনিও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করেন। তবে ততক্ষণে সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তার পক্ষে আর কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

এদিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে যে ২৯টি আসন জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হয়েছে, সেখানে ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনের প্রার্থী হিসেবে জিয়াউল হক মৃধার নাম লিখেছে তারা।

সেই জোরে এখন ভোটের প্রচারে তিনি বলছেন, “সিংহ-ই লাঙ্গল, সিংহ-ই নৌকা।”

অন্যদিকে তার জামাতা রেজাউল বলছেন, আইন লংঘন করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন জিয়াউল হক মৃধা।

তিনি বলেন, “আমার জানা মতে, উনি স্বতন্ত্র প্রার্থী, কোনো দলীয় প্রার্থী নন। বাংলাদেশে যে আইনে নির্বাচন হয় (আরপিও) সেখানে বলা আছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা স্বতন্ত্রই থাকবে, তারা দল এবং জোটের প্রার্থী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”

তার এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জিয়াউল হক মৃধা বলেন, “স্বতন্ত্র এটা মার্কাটা ঠিক, কিন্তু মহাজোট তালিকায় আমার নামই আছে, এখানে প্রতীকের একটা প্যাঁচ হয়েছে। জাতীয় পার্টি প্রথমে আমাকে মনোনয়ন দেইনি, পরে ফাইনাল মনোনয়ন আমাকে দিয়েছে। মহাজোট থেকেও আমাকে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমিই মহাজোট প্রার্থী।”

মহাজোটে আরেকজন লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করছেন, তারপরও কেন মহাজোটের নামে ভোট চাইছেন, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, এই ব্যাপারে কিচ্ছু হবে না। জনগণ মনে করবে যে, সিংহ-ই লাঙ্গল, সিংহ-ই নৌকা। এতে কোনো সমস্যা হবে না।”

শ্বশুরের দাবি খণ্ডন করে রেজাউল বলেন, “উনি (মৃধা) মনোনয়ন ফরমে স্বতন্ত্র প্রার্থী লিখে জমা দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এখন কোনো বিবেচনায় যদি উনি দাবি করে থাকেন তাহলে দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে উনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে, এখানে আমার কিছু বলার নেই। আইন তো সবার জন্য সমান থাকবে।”

বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন,  “দেশের আইন রক্ষার জন্য যে কোনো নাগরিক যেতে পারেন। আমিও যেতে পারি। মহাজোটের নেত্রীর ছবি বা জোটের নেতা এরশাদ সাহেবের ছবি ব্যবহার করলে… উনাদের যেহেতু প্রার্থী এখানে আছে, এটা একটা বিভ্রান্তিকর অবস্থা, এই ব্যাপারেও রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসার ব্যবস্থা নেবেন।”

জিয়াউল হক মৃধা লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ পেতে আপিল করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন রেজাউল।

তিনি বলেন, “তিনি নির্বাচন কমিশন থেকে প্রতীক নেওয়ার জন্য আপ্লাই করে ব্যর্থ হয়েছেন। তারপরে উনি হাই কোর্টে রিট করেছিলেন, হাই কোর্টও বলেছেন- না, এটার কোনো সুযোগ নেই। হাই কোর্টের আদেশ যদি লঙ্ঘিত হয় সেটা হাই কোর্ট বিবেচনা করবে যে উনাদের আদেশ লঙ্ঘিত হয়েছে। আমার মাথা ব্যাথার কারণ নেই।”

লাঙ্গলের প্রার্থীর সাথে কোনো ধরনের সমঝোতা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে জিয়াউল হক মৃধা বলেন, “না, কোনো সমঝোতা হয়নি। তার তো বৈধতাই নেই। সে তো মহাজোটের প্রার্থী না। এক আসনে তো দুইজন থাকতে পারে না।”

স্বতন্ত্র প্রার্থীর সিংহ মার্কার পোস্টার-ফেস্টুনে মহাজোটের প্রার্থী লেখাটা একজন আইনজীবী হিসেবে কীভাবে দেখছেন, জানতে চাইলে মৃধা বলেন, “এখন পর্যন্ত আমাকে বলেনি যে, আপনি মহাজোটের প্রার্থী না। কারণ মহাজোটের চূড়ান্ত তালিকায় আমার নামই আছে। এবং মহাজোট থেকে দেওয়া জাতীয় পার্টির যে ২৯টি আসন আছে, সেই তালিকায়ও আমার নামই আছে।”

বর্তমান সাংসদ জিয়াউল হক মৃধার দাবি, স্থানীয় আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মীই তার পক্ষে আছেন। এলাকায়ও তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। ভোটে তিনিই জয়ী হবেন।

এদিকে রোববার আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউল হক মৃধার মহাজোট প্রার্থী ঘোষণার প্রতিবাদ জানোনো হয়েছে। একইসঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী মঈন উদ্দিনের পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

লাঙ্গলের পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সমর্থন পাচ্ছেন কি না জানতে চাইলে রেজাউল ইসলাম বলেন, “দল তো মনোনয়ন দিয়েছে এবং পূণাঙ্গ সাপোর্ট দিচ্ছে। মাঠে যথেষ্ট সাড়া পাচ্ছি, ইনশাল্লাহ ৩০ তারিখে জয়যুক্ত হব। আমার সাথে আওয়ামী লীগের লোকজন কাজ করছে।”

আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মঈন উদ্দিনের পক্ষে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষের সমর্থন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, আছে কিছু লোকজন। এটা সামান্য, হিসাবের মধ্যে না। তবে আমার দাবি আছে, মহাজোট নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, দল যারা করে তাদের নেত্রীর সিদ্ধান্ত মানা উচিত। প্রতিটি আসনের নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভোটারদের মন জয় করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।”

জিয়াউল হক মৃধা নাকি জামাতা রেজাউল ইসলাম ভূইয়া- কাকে প্রার্থী রাখছেন তারা সে বিষয়ে জানতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের বিশেষ সহাকরী রুহুল আমিন হাওলাদার এবং দলটির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাঁর মোবাইলে একাধিকবার ফোন করে ও এসএমএস পাঠিয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি।

‘সুবিধাজনক অবস্থানে’ উকিল সাত্তার ভূইয়া

এই আসনে বিএনপি ও তার শরিক দলগুলো মিলিয়ে একক প্রার্থী হয়েছেন আব্দুস সাত্তার ভূইয়া। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুই মেয়াদে সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোট এ আসনে ইসলামী ঐক্য জোটের তৎকালীন চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনীকে মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ক্ষমতায় এলে সাত্তারকে টেকনোক্র্যাট কোটায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী করেছিলেন খালেদা জিয়া।

এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে মুফতি আমিনীকে ফের বিএনপি জোটের প্রার্থী করা হলে তিনি মহাজোটের জিয়াউল হক মৃধার কাছে হেরে যান। এর মধ্যে ফজলুল হক আমিনীও মারা যান।

এবার এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে উকিল আব্দুস সাত্তার ভূইয়া ২২ বছর পর আবারও ধানের শীষ মার্কায় ভোটের মাঠে রয়েছেন।

স্থানীয় অনেকে বলছেন, বিএনপির জ্যেষ্ঠ এ নেতা ভাটি এলাকার মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়, উপজেলা সদরেও তার অনেক কর্মী-সমর্থক রয়েছে। মহাজোটের মধ্যে ‘বিভক্তির’ কারণে এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন উকিল আব্দুস সাত্তার ভূইয়া।

এক ফেইসবুক পোস্টে এই শঙ্কার কথাই জানিয়েছেন সরাইল উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বেলায়েত হোসেন মিল্লাত।

১৬ ডিসেম্বর ফেইসবুকে তিনি লেখেন, “একই আসনে ব্যানার, পোস্টার, স্লোগান ও মাইকিংয়ে মহাজোট প্রার্থিতা দাবি দুইজনের। বিপাকে সাধারণ জনগণ, নীরব ভূমিকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ফায়দা লুটছে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সুবিধাবাদীরা।”

শিগগিরই এই জট খোলার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে মহাজোটের প্রার্থী নিয়ে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তির চিত্র উঠে এসেছে কয়েকজনের বক্তব্যে।

মহাজোটের প্রার্থী কে, জানতে চাইলে স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক সামিউল ইসলাম বলেন, “জাতীয় পার্টি থেকে দুইজন মহাজোটের প্রচারণা করছেন। একজন জিউয়াউল হক মৃধা, আরেকজন তার জামাতা রেজাউল ইসলাম। পোস্টারে দুইজনই মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে দাবি করছেন। মাইকিংয়েও একই প্রচারণা। এখন বিষয়টি তো ক্লিয়ার হচ্ছে না, আসল ঘটনা কী?”

আরেক ভোটার আনিছুর রহমান বলেন, “শুনলাম মাইকিং করছে, বলা হচ্ছে সিংহ-ই লাঙ্গল, লাঙ্গল-ই নৌকা। তাহলে কীভাবে এর সমাধান হবে বুঝতে পারি না।”

অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী  প্রার্থীরা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী রয়েছেন সরাইল-আশুগঞ্জে। তিন লাখ ৩৫ হাজার ৪০২ ভোটারের এ আসনে লাঙ্গল ও ধানের শীষসহ ১৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

জিয়াউল হক মৃধার সিংহ এবং মঈন উদ্দিনের কলারছড়া ছাড়াও অন্য প্রার্থীরা হলেন- জাকের পার্টির জহিরুল ইসলাম জুয়েল (গোলপ ফুল), জাতীয় পার্টি-জেপির মু. জামিলুল হক বকুল (বাইসাইকেল), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মো. জুনায়েদ আল হাবীব (খেজুর গাছ), সিপিবির মো. ঈসা খান (কাস্তে), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জাকির হোসেন (হাতপাখা), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. মহিউদ্দিন মোল্লা (মোমবাতি), গণফোরামের শাহ মফিজ (উদয়মান সূর্য) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোখলেছুর রহমান (মটরগাড়ি) ও স্বতন্ত্র মো. গিয়াস উদ্দিন (ডাব)।

সূত্র : বিডিনিউজ২৪

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

ওয়েবসাইটের কোন কনটেন্ট অনুমতি ব্যতিত কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design & Developed BY ThemesBazar.Com