রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ১০:০১ অপরাহ্ন

বজ্রপাতের পূর্বাভাস পান না হাওরবাসী, সুফল মিলেনি তালবীজে

নিজস্ব প্রতিবেদক : হাওরে নতুন আতঙ্কের নাম বজ্রপাত। বৃষ্টির মৌসুমে বেড়ে যায় বজ্রপাত। বাড়ে প্রাণহানি। গত কয়েকবছর ধরে বজ্রপাত আশঙ্কাজনক হারে বাড়লেও এ ব্যাপারে কৃষকদের অগ্রীম সতর্ক করতে নেই কোনো উদ্যোগ। বজ্রপাতে হতাহতের পরিমাণ কমাতেও তেমন কোনো তৎপরতা নেই।

বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাওর এলাকায় গত দুই বছর লক্ষাধিক তালবীজ রোপন করা হয়। তবে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। বেশিরভাগ তালবীজ থেকেই চারা গজায়নি।

এ অবস্থায় আরেকটি বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে বজ্রপাত আর প্রাণহানির ঘটনা। গত এক সপ্তাহে বজ্রপাতে সিলেট বিভাগে মারা গেছেন ৪ জন আর আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বৈশাখ থেকে ঝড়বৃষ্টি আর বজ্রপাতের পরিমান বাড়বে। এই সময়টাই হাওরের সবচেয়ে ব্যস্ততম সময়। হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান তোলা হয় এই সময়ে। ফলে হাওরের কৃষকদের মাঠে যেতেই হয় এই সময়টাতে। এতে প্রাণহানি আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বেশি ১০৫টি হাওর আছে সিলেট জেলায়। আর সুনামগঞ্জ জেলায় হাওর আছে ৯৫টি। ও সংখ্যায় সিলেট জেলায় হাওর বেশি হলেও আয়তনের দিক দিয়ে হাওড় এলাকা বেশি সুনামগঞ্জে। বজ্রপাতে বেশি প্রাণহানিও ঘটে এই জেলায়।

আবহাওয়া অফিসের হিসেবমতেও, দেশের সবচয়ে বজ্রপাত প্রবণ এলাকা সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বজ্রপাতে সুনামগঞ্জে ২০১৬ সালে মারা যান ১৮জন, ২০১৭ সালে ৮ জন আর ২০১৮ সালে  ২০ জন।

এসব ব্যাপারে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ বলেন, বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গতবছর হাওর এলাকায় তালবীজ রোপন ও বিতরণ করা হয়েছিলো। তবে এটা অনেক দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া। তাছাড়া হাওহ অঞ্চলে বেশিরভাগ সময়ই পানি থেকে। এতে বেশিরভাগ বীজই নষ্ট হয়ে গেছে। চারা গজায়নি। এই উদ্যোগটি ফলপ্রসু হয়নি।

তিনি বলেন, এখন আমরা হাওরের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় হিজল করচ গাছ রোপনের উদ্যোগ নিচ্ছি। এর পাশপাশি শীঘ্রই আরও ২৫০০ তাল গাছের চারা হাওহ এলাকার স্কুলগুলোতে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি।

বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যাওয়ায় গত বছর দেশের বিভিন্ন স্থানের সাথে সিলেট আবহাওয়া অফিসেও স্থাপন করা হয় বজ্রপাত পূর্ভাবাস যন্ত্র ‘থান্ডারস্ট্রোম ডিটেকটিভ সেন্সর’। এই যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিদিনই বজ্রপাতের পূর্ভাবাস আসে। আবহাওয়া অফিস থেকে এই পূর্ভাবাস প্রতিটি জেলার সরকারী অফিসগুলোতে ই-মেইলে পাঠানো হয়। তবে এই পূবাভাস মাঠ পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের কাছে আর পৌঁছে না। হাওরের কৃষকদের কাছে বজ্রপাতের পূর্ভাবাস পাঠানোর এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যেগি নেই।

সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ২০১৬ সালের পর থেকে বজ্রপাতকে একটি দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। সাধারণত পাহাড়বেষ্টিত এলাকা ও খোলা জায়গায় বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি থাকে। এই হিসেবে সিলেট বজ্রপাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।

তিনি বলেন, ১২ ঘন্টা আগে আমরা বজ্রপাতের পূর্ভাবাস পাই। আমরা যে বজ্রপাত পূর্ভাবাস সরকারি দপ্তরে পাঠাই সেটি হাওরাঞ্চলের মানুষজনের কাছে পৌঁছাতে হবে। এটি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরাই করতে হবে। পূর্ভাবাস পেলে ওই সময় হাওরে কাজ করা থেকে তারা বিরত থাকতে পারবেন। তবে ডিজিটাল মাধ্যমে যে কেউ আবহাওয়ার পূর্ভাবাস জানতে পারবেন। মোবাইলে ওয়েদার অ্যাপের মাধ্যমে যে কেউ সেই তথ্য পেতে পারেন।

বজ্রপাত আটকে দেবে তালগাছ, এই ধারণা থেকে কেবল সুনামগঞ্জ জেলায়ই ২০১৮ সালে ৩৪ হাজার ও চলতি বছরে ৮০ হাজার তালবীজ বিতরণ করা হয়। তবে স্থানীয়রা বলছেন, এই লক্ষাধিক বীজ থেকে হাজারখানেক চারাও গজায় নি।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ৫নং সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এহসান চৌধুরী বলেন, ২০১৭ সালে আমাদের কিছু তালবীজ দেওয়া হয় উপজেলা প্রশাসন থেকে। আমরা রোপন করেছি কিন্তু গাছ হয়নি। সব বীজই নষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, তালবীজ থেকে গাছ হলেও তাতে তাৎক্ষণিক কোনো সুফল মিলবে না। গাছের আকৃতি আসতেই তিন বছর সময় লাগে। আর গাছ বড় হয়ে বজ্রপাত ঠেকাতে অনেক বছর লেগে যাবে। বীজের বদলে মাঝারি সাইজের তালগাছ দিলে বরং ভালো হতো।

তিনি বলেন, বজ্রপাতের কোনো পূর্ভাবাস আমরা পাই না। তাই যখন দেখি আকাশের অবস্থা ভাল না তখন ইউপি সদস্যদের কল দিয়ে বলি তাদের এলাকায় কেউ যেন মাঠে না যায়।

একই কথা বললেন উপজেলার ৭নং জগদল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শিবলী আহমদ বেগ। তিনি বলেন, বীজ পেয়ে আমি ওর্য়াড মেম্বারদের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেছি, কিন্তু এতে গাছ হয়নি। আমরা কৃষিকাজ করি, ধান রোপন করতে পারি। কিন্তু তালবীজ কোনোদিন রোপন করি নাই। এই বীজ কিভাবে সংরক্ষন করতে হয় তাও জানি না। এটা কেউ আমাদের শেখায়ও নি।

সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় ২০১৮ সালে তালবীজ বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রসাশনের পক্ষ থেকে তালবীজ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে আর কোনো তদারকি করা হয়নি।

সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ফরিদুল হক বলেন,, বীজ বিতরণ করলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকার কারনে সেটা মনিটরিং করতে পারছি না। তাই ইউনিয়ন পর্যায়ে বীজগুলো রোপন করা হয়েছে কি না সেটা জানি না। এছাড়া বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে কৃষকের হাতে বীজ পৌঁছাতে অনেক বীজ নষ্ট হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটা অনেক দীর্ঘমেয়াদিও। ফলে এখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় তালের চারা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে তাল গাছের চারা বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে।

তবে হাওর নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ বা তৎপরতা নেই প্রশাসনের। দায়সারা ও অকার্যকর তালবীজ বিতরণেই শেষ প্রশাসনের সব পদক্ষেপ।

এ ব্যাপারে পরিবেশ ও হাওড় উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, বৃষ্টির মৌসুমেই বোরো ফসল ঘরে ওঠে। তাই এইসময়ে কৃষকদের মাঠে যেতেই হবে। এজন্য হাওরে কিছু আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি আমরা। যাতে যেন কৃষকরা মাঠে কাজ করতে গেলে বজ্রবৃষ্টির সময় আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পারে। এছাড়া হাওরে বজ্রপাত নিরোদক দন্ড স্থাপন করা দরকার। এসব দাবি আমরা বিভিন্ন সময় জানিয়েছি। তবে মৌখিক আশ্বাস ছাড়া এখন পর্যন্ত কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

ওয়েবসাইটের কোন কনটেন্ট অনুমতি ব্যতিত কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design & Developed BY ThemesBazar.Com