বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ১১:১২ পূর্বাহ্ন

ওড়িশায় তাণ্ডব বাংলাদেশে দুর্যোগ

ফণীর প্রভাবে বাড়ছে পানি। বালির বস্তা দিয়ে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা। কয়রা উপজেলার বাটিখালী থেকে ছবিটি তুলা হয়েছে (বাঁয়ে) লণ্ডভণ্ড ওড়িশা (ডানে)

তরফ নিউজ ডেস্ক : ঘূর্ণিঝড় ফণীর তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ভারতের ওড়িশা রাজ্য। প্রবল এই ঘূর্ণিঝড় গতকাল ওড়িশায় আঘাত হানে। পরে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের স্থলভাগে প্রবেশ করে। মধ্যরাতের পর থেকে বিস্তৃত এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়ে পুরো দেশে। তবে খুলনা-যশোর অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করা ঘূর্ণিঝড়ের গতি কিছুটা কমে গেলেও তা আজ সকাল পর্যন্ত বাংলাদেশের স্থলভাগেই অবস্থান করবে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দিনভর ভারি বৃষ্টি হতে পারে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। গত রাতে ফণীর অগ্রভাব বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই ঢাকাসহ সারাদেশে ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়। সন্ধ্যায় বজ্রপাতে কিশোরগঞ্জে ৬ জনের মৃত্যু হয়।

বাগেরহাটে গাছ পড়ে মারা গেছেন একজন।

ফণীর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সন্ধ্যার আগেই প্রায় সাড়ে ১২ লাখ মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লন্ডন সফরে থাকা প্রধানমন্ত্রী সেখান থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ছুটি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শুক্র ও শনিবার খোলা রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কলকাতা বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় গতকাল বিকাল থেকে ঢাকা-কলকাতা বিমান চলাচল বন্ধ ছিল। এছাড়া আরও কিছু রুটে বাংলাদেশ বিমান ও বেসরকারি এয়ার লাইন্সের ফ্লাইট বাতিল ও শিডিউল পরিবর্তন করা হয়।

প্রায় নিরক্ষ রেখার কাছে ২৫শে এপ্রিল জন্ম নেয় ঘূর্ণিঝড় ফণী। ৮ দিন পর ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার গতিবেগে আছড়ে পরে উপকূলে। বৃহস্পতিবার ভারতের ওড়িশা উপকূলে আঘাত হানা ঝড় রাজ্যটিকে লন্ডভন্ড করে এগিয়ে আসে পশ্চিমবঙ্গের দিকে। শুক্রবার মধ্য রাত ও শনিবার সকালের মধ্যে ৯০ থেকে ১১০ কিলোমিটার গতিবেগে বৃহত্তর যশোর অঞ্চল হয়ে বাংলাদেশের স্থলভাগ অতিক্রম করবে এটি। খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের ওপর দিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করে পৌঁছাবে ভারতের মেঘালয়ে।

বুয়েটের প্রফেসর ড. একেএম সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, শ্রীলঙ্কা থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ও বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় নিরক্ষ রেখার কাছে ঘুর্ণিঝড়টির উৎপত্তি। গত ২৫শে এপ্রিল যখন এটি বড় আকার ধারণ করে তখন এটির নাম নির্ধারণ করা হয় ফণী। সাধারণত এতো দূর থেকে কোনো ঝড় উপকূলে আসেনা। সাগরেই শেষ হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার ভারতের ওড়িশা উপকূলে আঘাত হানার পর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় রাজ্যটির। শুক্রবার সন্ধ্যায় এটির অবস্থান ওড়িশার শেষ অংশ ও কলকাতার কাছাকাছি ছিল। আজ শনিবার সকাল নাগাদ যশোর অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে। সাধারণত উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বড় ঘুর্ণিঝড় আঘাত হানে। কিন্তু ফণী একেবারেই ব্যতিক্রম। এটি লোকালয় দিয়ে প্রবেশ করে অনেক দূর যাবে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

বাগেরহাটে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ৫ গ্রাম প্লাবিত, নিহত ১: ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে শুক্রবার দুপুরে সদর উপজেলার রণজিৎপুর গ্রামে মাথার উপর গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে শাহানুর বেগম (৫০) নামে এক গৃহবধু মারা গেছেন। দুপুর থেকেই সুন্দরবনসহ বাগেরহাটের বিভিন্ন নদীর পানি ফুসে উঠেছে। দুপুরে শরণখোলা উপজেলার বলেশ্বর নদীর প্রবল স্রোতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের বগী এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বগী, উত্তর সাউথখালী, দক্ষিণ সাউথখালী, চালিতাবুনিয়া ও দক্ষিণ চালিতাবুনিয়া নামে ৫ গ্রাম প্লাবিত হয়। দুপুর থেকে বাগেরহাট জেলার উপর দিয়ে বইতে শুরু করে ঝড়ো হাওয়া। গুড়ি-গুড়ি ও মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আতংকিত লোকজন বিকাল থেকেই জেলার ২৩৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে শুরু করেন। সন্ধ্যার আগেই লোকজন দোকানপাঠ বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে দেখা যায়।

এদিকে, সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চর, আলোরকোল, কটকা ও শ্যালার চরে অবস্থানরত বনকর্মী ও জেলেরা আশ্রয় কেন্দ্রে নিরাপদে রয়েছেন। মংলা বন্দরের পণ্য ওঠানামা বন্ধ রেখে বন্দর চ্যানেল খালী করা হয়েছে। ঝড় পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়ার জন্য মংলায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ২১টি জাহাজকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ আঘাত আনলে ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড সুন্দরবনের অসংখ্য বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হবার আশংকা রয়েছে।

খুলনায় আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ: শুক্রবার দুপুর থেকে খুলনায় বাড়তে থাকে বাতাস ও নদ-নদীর জোয়ারের পানি। উপকূলীয় উপজেলা কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছার লোকজনকে নিকটস্থ  ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে আনতে শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। আবার বাতাস শুরুর পর থেকে স্বেচ্ছায় কেউ কেউ আশ্রয় কেন্দ্রে আসা শুরু করেন। সহায় সম্পদ রক্ষার জন্য পুরুষরা ঘরে থেকে গেলেও বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যান। কোনো কোনো এলাকার মানুষ ঘর-বাড়ি ছাড়তে না চাইলে তাদের জোর করে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যায় স্থানীয় প্রশাসন। প্রথমে দাকোপ উপজেলার ৪নং খোনা খাটাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খোনা কে বি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষকে নিয়ে আসা হয়। পর্যায়ক্রমে কয়রা ও পাইকগাছার আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মানুষ আনা হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায়। পাশাপাশি আশ্রয় কেন্দ্রে আসার জন্য চলছে মাইকিং। খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বেলাল হোসেন বলেন, দুপুরের দিকে কিছু মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আসছেন। মানুষ এখানে আসতে চান না।

মির্জাগঞ্জে ফণীর প্রভাবে ৪ গ্রাম প্লাবিত: ফণীর প্রভাবে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পায়রা নদীতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বেড়িবাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করে চার গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গতকাল দুপুরে উপজেলার দেউলী সুবিদখালী ইউনয়নের মেহেন্দিয়াবাদ গ্রামের প্রায় দেড়শ ফুট ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে মেহেন্দিয়াবাদ, গোলখালী, চরখালী ও রাণীপুর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল জাকী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এসকল এলাকার বাসিন্দাদের শুক্রবার দুপুরের আগেই আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও পায়রা নদী বেষ্টিত উপজেলার সর্বমোট ৪২টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় দুই হাজার লোককে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার সংরক্ষিত রয়েছে।

মির্জাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খান মো. আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, ২০০৭ সালের ১৫ই নভেম্বর রাতে ঘূর্ণিঝড় সিডরের তাণ্ডবে বাঁধ ভেঙে প্রবল জলোচ্ছ্বাসে লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের পায়রা পাড়ের বাড়িঘর, গাছপালা, কেড়ে নিয়েছিল ১১৬ জন নারী পুরুষ ও শিশুর প্রাণ। এমনিতেই পায়রা পাড়ের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত।

লক্ষ্মীপুরে ৩ হাজার মানুষ নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে: রামগতির দ্বীপ চরগজারিয়া, তেলিরচর,বয়ারচর ও সদর উপজেলার চররমনী ও চরমেঘা এলাকা থেকে প্রায় ৩ হাজার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এখনো ২০ হাজার মানুষ ঝুকিপূর্ণভাবে চরাঞ্চলে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। পাশাপাশি আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো এখনো শুকানো খাবার পায়নি বলে অভিযোগ করেন। তবে রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল হক জানান, ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় সকল প্রস্তুুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। গতকাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ শতাধিক মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদেরও নিরাপদে সরিয়ে আনতে চরাঞ্চলে নৌকা পাঠানো হয়েছে। তবে অনেক মানুষ তাদের বাসস্থান ছেড়ে আসতে চায়না, তারপরও সবাইকে নিরাপদে আনার জন্য কাজ করছে প্রশাসন।

শুক্রবার দুপুরে রামগতি উপজেলায় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পাল।
উত্তাল পদ্মা, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ: ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে উত্তাল হয়ে পড়েছে মানিকগঞ্জের পদ্মা নদী। এতে করে শুক্রবার বিকাল থেকে নৌ দুর্ঘটনা এড়াতে বন্ধ রাখা হয়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের ফেরি চলাচল। এতে উভয় ঘাটে আটকে পড়েছে শতাধিক বাস-ট্রাকসহ ছোট বড় যানবাহন। এছাড়া থেমে থেমে প্রবল বাতাস আর বৃষ্টিতে পদ্মা ক্রমেই উত্তাল হয়ে পড়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নৌপথ।

পাটুরিয়া ফেরি সেক্টরের বাণিজ্য বিভাগের ব্যবস্থাপক সালাউদ্দিন হোসেন জানান, সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি আর বাতাস থাকলেও ফেরি চলাচলে তেমন কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। তবে সীমিত আকারে ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছিল। বিকালের দিকে পদ্মা উত্তাল হয়ে পড়ায় ফেরি চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে কর্তৃপক্ষ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে সকল প্রকার ফেরি চলাচল বন্ধ রাখে। ফেরিগুলো নিরপদ স্থানে নোঙর করে রাখা হয়েছে। এদিকে বিকাল থেকে ফেরি পারাপার বন্ধ থাকায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াতকারী যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কয়েকশ যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় আটকে থাকে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া কার্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক আবু আব্দুল্লাহ জানান, ফেরিঘাট এলাকায় যানবাহনের চাপ রয়েছে। সর্বশেষ দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় বাস, ট্রাক ও ছোট গাড়ি মিলে চার শতাধিক যানবাহন নৌরুটে পারের অপেক্ষায় রয়েছে।

ফণীর ছোবলে লণ্ডভণ্ড ওড়িশা
কোথাও রাস্তার ধারে উপড়ে পড়েছে গাছ, উল্টে গেছে গাড়ি। কোথাও উড়ে গেছে বাড়ির ছাদ। আবার কোথাও সিএনজি স্টেশনে হয়েছে বিস্ফোরণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারাদিনজুড়ে এমন নানা ভিডিও দেখা গেছে। এসবই ঘটেছে ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে।

স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শুক্রবার (৩রা মে) স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে গড়ে ঘণ্টায় ১৪২ কিলোমিটার গতিবেগ নিয়ে ভারতের ওড়িশায় আঘাত হানে ফণী। এরপর প্রায় সারাদিন গড়ে ঘণ্টায় ২০০-২৪৫ কিলোমিটার গতিবেগ নিয়ে পুরো রাজ্যজুড়ে তাণ্ডব চালায়। একসময় কিছুটা দুর্বল হয়ে এগিয়ে যায় কলকাতার দিকে। কিন্তু ইতিমধ্যে কেড়ে নেয় অন্তত তিন প্রাণ।

ভারতের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণী। তবে ওড়িশায় তাণ্ডবের পর কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড়টি। বর্তমান গতিবিধি অনুসারে, ভোররাতের দিকেই ঘণ্টায় ১১৫ কিলোমিটার গতিবেগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হানবে এই দুর্যোগ। এর আগে সন্ধ্যার দিকে সেখানে তীব্র ঝড়ো হাওয়ায় মেদিনীপুরে তাণ্ডব চালায় ফণী।

ভারতে ফণীর কাছাকাছি মাত্রার বিগত সব ঘূর্নিঝড়গুলোর চেয়ে এবার প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। আগ থেকেই প্রস্তুত ছিল রাজ্য সরকার। ফণী আঘাত হানার আগেই সাড়ে ১১ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। স্থাপন করা হয় কয়েকশ’ আশ্রয়কেন্দ্র, মজুত করা হয় পর্যাপ্ত ত্রাণ। বেসামরিকদের সাহায্য করতে মোতায়েন করা হয় স্বেচ্ছাসেবী ও সরকারি বাহিনীর সদস্যদের। কিন্তু তবুও তিনটি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ভয়ানক এই ঘূর্ণিঝড়।

কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, ওড়িশায় শুক্রবার ফণীর আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন তিন জন। এর মধ্যে একজন নারী, একজন কিশোর ও একজন ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ রয়েছেন।

ওড়িশার বিশেষ ত্রাণ কমিশনার বিষ্ণুপাডা শেঠি বলেন, আমি তিন জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করতে পারবো। এর মধ্যে একজন বৃদ্ধ আশ্রয়কেন্দ্রে ‘হার্ট অ্যাটাকে’ মারা গেছেন। অপর একজন কিশোর আমাদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঝড়ের মধ্যে বাইরে যায়। সেসময় তার ওপর একটি গাছ উপড়ে পড়লে সে মারা যায়। এ ছাড়া এক নারী ঝড়ের আঘাত থেকে বাঁচতে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সময় বাতাসে উড়ে আসা পাথরের আঘাতে প্রাণ হারান।

প্রাণহানি কম হলেও, ঘর-বাড়ি ও সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ হয়েছে বিপুল। সমূলে উৎপাটিত হয়েছে বহু গাছ। ভারি বর্ষণের ফলে মন্দিরের শহর পুরীর বহু এলাকা এখন জলের তলায়। অন্ধ্রপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী বহু এলাকায় বইছে ঝড়ো হাওয়া।

ওড়িশার বেশিরভাগ অংশেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গাছ উপড়ে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাতিল করে দেয়া হয়েছে শতাধিক ফ্লাইট ও ট্রেন।

এককথায় পুরো ওড়িশাজুড়ে নেমে এসেছে এক থমথমে অবস্থা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, কোথাও নির্মাণাধীন কোনো ভবনের পাশে ভেঙে পড়ছে ক্রেন, রাস্তার পাশে থাকা গাড়ি উল্টে দিচ্ছে ঝড়ো বাতাস, রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে আছে উৎপাটিত গাছ। স্থানীয় পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীরা সেসব রাস্তা থেকে সরাচ্ছেন।

এদিকে, শুক্রবার দুপুর থেকেই বন্ধ করে দেয়া হয় কলকাতা বিমানবন্দর। আজ সকাল ৮টা নাগাদ বিমানবন্দর খুলে দেয়ার কথা রয়েছে।

উল্লেখ্য, বিপর্যয় মোকাবিলায় বিশাখাপত্তনম, চেন্নাই, পারাদ্বীপ, গোপালপুর, হলদিয়া, ফ্রেজারগঞ্জ ও কলকাতায় উপকূলরক্ষী বাহিনীর ৩৪টি উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশাখাপত্তনম ও চেন্নাইয়ে মজুত রয়েছে ৪টি উদ্ধারকারী জাহাজ।

এদিকে, ঘূর্ণিঝড়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছুটা ব্যাহত হয়েছে লোকসভা নির্বাচনও। এখন পর্যন্ত যদিও কোনো নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা আসেনি। তবে নির্বাচনী প্রচারণা স্থগিত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ একাধিক নেতা।

শুক্রবার এক টুইটে মমতা জানান, ফণী সাইক্লোনের কারণে আসন্ন দুর্যোগের জন্য আমি আগামী ৪৮ ঘণ্টা আমার সমস্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থগিত রাখলাম। আমরা রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং চালাচ্ছি। সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। সাধারণ মানুষের কাছে আমরা সহযোগিতা কামনা করি। আগামী দুই দিন সাবধানে থাকুন, নিরাপদে থাকুন।
এদিকে, শুক্রবার ফণীর প্রভাবে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ভারি বৃষ্টিপাত শুরু হয়। থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও। স্থানীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী দুই দিন এভাবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

ওয়েবসাইটের কোন কনটেন্ট অনুমতি ব্যতিত কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design & Developed BY ThemesBazar.Com