বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ০৬:৩৮ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
ঘূর্ণিঝড় রেমাল: ১৯ উপজেলার নির্বাচন স্থগিত বাহুবল উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অবাদ, সুন্দর ও দাঙ্গামুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাসার ছাদে আম পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শিশুর মৃত্যু রেমাল পরিণত প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে, মহাবিপদ সংকেত বাহুবলে ৫ আওয়ামীলীগ নেতাকে হারিয়ে আলেম চেয়ারম্যান নির্বাচিত শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাস যোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পুলিশ বদ্ধপরিকর- এসপি আক্তার হোসেন জনগণ যাকে ভালবাসবে, দায়িত্ব দিতে চাইবে, তাকেই দেবে- জেলা প্রশাসক বাহুবলে বিয়ের আনন্দ-ফুর্তি চলাকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যুবতীর মুত্যু বাহুবল উপজেলা নির্বাচন : ২০ প্রার্থীর মাঝে নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ বাহুবল উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

সংসদে কেমন হবে ঐক্যের বিরোধী দল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা :

* সংবিধানে বাধ্যবাধকতা না থাকলে একই সঙ্গে সখ্য আর বিরোধিতা হয় না।

* নতুন তরিকা, দুনিয়ার কারও সঙ্গে মেলে না : শাহদীন মালিক

ঐক্য বজায় রেখেই শরিকদের সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তবে সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা ঐক্য রেখে কীভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েছে শরিকরা। সরকারি দলের সঙ্গে সখ্য রেখে জাতীয় সংসদে সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সূত্র জানায়, মূলত একটি কার্যকর সংসদ গড়ে তুলতে মহাজোট ও ১৪ দলের মিত্রদের বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখতে চায় আওয়ামী লীগ। নিবার্চনের পরই বিরোধী দলে থাকার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় পার্টি। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিরোধী দলে থাকা না থাকা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করতে চায় তারা। জাপা ছাড়া বেশিরভাগ দলের সাংসদরাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক ‘নৌকা’ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এসব বিষয় নিয়ে জোটের বৈঠক না হলেও নিজেদের দলীয় ফোরামে একাধিকবার আলোচনা করেছে দলগুলো। কিন্তু জোটের প্রধান দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা না হওয়ায় এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সংসদের প্রথম অধিবেশনের সময় ঘনিয়ে এলেও সরকারের সঙ্গে ঐক্য ধরে রেখে কীভাবে তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটেনি শরিক দলগুলোর। বেশিরভাগ দলই সরকারের সঙ্গে থাকতে আগ্রহী।

এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মহাজোটের দলগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। যার ফলে নিজের প্রতীকে নির্বাচন করারও সুযোগ দিয়েছে দলগুলোকে। দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হওয়া মানে ওই দলেরই প্রতিনিধি। সে ক্ষেত্রে এসব শরিক সংসদে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারবে না। কারণ সরকারের সঙ্গে সবার ঐক্য থাকবে। ঐক্য আর বিরোধিতা একসঙ্গে হয় না।

শরিক দলের একজন নেতার মতে, সংবিধানে বাধা না থাকলেও একই সঙ্গে সখ্য আর বিরোধিতা করা যায় না। দুই দিকে পা বাড়ালে যা হওয়ার তাই হবে। তাছাড়া শরিক দলগুলোও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায় জোট বেঁধেছে। তাই বিরোধী দলে না গিয়ে সরকারের অংশীদার হতে চায় ছোট দলগুলো। এরই মধ্যে অনেকই তা স্পষ্ট করেছেন। এই অবস্থায় তাদের বিরোধী দলে ঠেলে দিলেই তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে না।

একই অবস্থা জাতীয় পার্টিরও। আলাদাভাবে বিরোধী দলে থাকলেও তারা সরকারি দলের সঙ্গে জোটে আছে। সে ক্ষেত্রে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালনেও তাদের বাধ্যবাধকতা থাকবে। নৌকা নিয়ে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের শরিকদের বিরোধী দলে থাকতে সংবিধানে কোনো বাধা না থাকলেও গণতান্ত্রিক বিশ্বে তা বিরল বলে জানিয়েছেন আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক।

আলাপকালে তিনি বলেন, দল বদল করলে সংবিধানে বাধা আছে কেবল দলীয় প্রার্থীর ক্ষেত্রে। জোটের প্রার্থীদের ব্যাপারে বাধা নেই। কেননা তারা নিজের দলের সিদ্ধান্তে প্রার্থী হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তে প্রার্থী হননি। এ ক্ষেত্রে প্রতীক বাধা হবে না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও বাধা হবে না। শরিকদের যে কেউ চাইলে বিরোধী দল হতে পারবে। তবে এমন সংস্কৃতি দুনিয়ার সঙ্গে মিলে না। এদেশে নতুন এক তরিকা চালু হয়েছে। যে তরিকা অন্য দুনিয়ার সঙ্গে মিলে না। আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে সব দলের নাম উল্লেখ করে তাদের নৌকা প্রতীক দিতে চিঠি দেয়া হয়েছিল। সেক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে শরিক দলের সাংসদরা আওয়ামী লীগের দলীয় কেউ না। তাই তারা চাইলে সংসদে বিরোধী দল হতে পারবে। এতে ৭০ অনুচ্ছেদ কোনো বাধা হবে না।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরুপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

সম্প্রতি শরিক দলগুলোকে সংসদে বিরোধী দলে থাকার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ১৪ দলের শরিকরা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলে তাদের জন্য ভালো এবং সরকারের জন্যও ভালো। শরিকদের অনেকেই বিরোধী দলে থাকবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বিরোধী দল বা বিরোধী কণ্ঠ যত কনস্ট্রাকটিভ (গঠনমূলক) হবে, ততই সরকারি দল কোনো ভুল করলে সেই ভুলটা সংশোধন করতে পারবে। কারণ বিরোধী দল না থাকলে তো একতরফা কাজ চলবে। বিরোধী দল থাকলে বিরোধিতা থেকে সরকারের কিছু শিক্ষণীয় বিষয় থাকবে। সমালোচনা থেকে শুদ্ধ হতে পারবে। সমালোচনা তো মানুষকে শুদ্ধ করে।

মহাজোটর অন্যমত শরিক জাতীয় পার্টি মহাসচিব মসিউর রহমান বলেন, ১৪ দলের সংসদ সদস্যরা জাতীয় পার্টি সঙ্গে বিরোধী দলের ভূমিকায় এলে সংসদ আরও প্রাণবন্ত হবে। সম্মিলিতভাবে দেশ ও দেশের মানুষের পক্ষে কথা বলে সংসদকে কার্যকর রাখা যাবে বলে মনে করেন তিনি। তবে একই জোট থেকে নির্বািচত হয়ে বিরোধী দলে থাকলেও সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা কতটুকু পালন করতে পারবেন- তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

শরিক দলের নেতারা বলছেন, ১৪ দলীয় জোটে থেকে সত্যিকারের বিরোধী দল হওয়া যাবে না। সত্যিকারের বিরোধী দল হতে গেলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘ঐক্য’ ধরে রাখা কঠিন হবে। সরকারের সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকে বিরোধী দল হওয়া না হওয়াকে সমান বলে মনে করছেন অনেকেই।

এ প্রসঙ্গে মহাজোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও ১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়াকার্স পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, এ বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। শরিকও হবেন আবার বিরোধীও হবেন, এ দুটো তো মেলে না, হাস্যকর হয়ে যায়। এরই মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছে শরিক দলগুলো। তবে ১৪ দলের সিদ্ধান্ত না আসায় তারাও স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না। সংসদে তাদের অবস্থান কী হবে তা চূড়ান্ত করার আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা করতে চায় দলগুলো।

গত মঙ্গলবার রাশেদ খান মেননের সভাপতিত্বে ওয়াকার্স পার্টি পলিটব্যুরোর বৈঠক শেষে এসব বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টি স্পষ্টভাবে মনে করে, ২০০৪ সালে যেসব ভিত্তিতে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল, তার মূল বিষয়গুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। এই অবস্থায় জাতীয় নির্বাচনের বিজয় সুরক্ষায় ১৪ দলের ঐক্যবদ্ধতা ও এযাবৎকালের অবস্থান ও আচরণ সুরক্ষিত করা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করলেও শরিক দলগুলোকের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি মন্ত্রিসভায়। মহাজোটের এই বিশাল বিজয়ের সমাবেশেও দেখা যায়নি কোনো শরিক দলের নেতাদের। বিরোধী দলে থাকা নিয়ে শরিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা না করলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময় তাদের বিরোধী দলে থাকার কথা জানিয়েছেন। এ নিয়ে শুরু থেকেই ক্ষুব্ধ বেশিরভাগ শরিক নেতা।

প্রসঙ্গত, অভিন্ন কয়েকটি লক্ষ্য নিয়ে একমত হয়ে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তুলে সমমনা কয়েকটি রাজনৈতিক দল। প্রথমে এই ঐক্যের নাম দেয়া হয় ১৪ দল। বিভন্ন সময় ঐক্যের কলেবর বৃদ্ধি করে গঠন করা হয় মহাজোট। মহাজোট ও ১৪ দলীয় জোটের বাইরেও কিছু দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলে। এসব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলে আওয়ামী লীগ। এ আন্দোলনের ফলেই চার দলীয় জোট সরকার নিজেদের ইচ্ছামতো নির্বাচন করতে পারেনি। এরপর থেকে ১৪ দল ও মহাজোটের শরিক দলগুলোর সম্পর্ক দৃঢ় হতে থাকে। সুসম্পর্কের কারণে শরিকদের অনেকেই আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন জোটের শরিকদের মন্ত্রিসভায় যুক্ত করলেও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নিবার্চনে জয় লাভ করার পর থেকে জোট মিত্রদের সঙ্গে ঐক্য অটুট রেখে বিরোধী দলে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করছে পরপর তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

ওয়েবসাইটের কোন কনটেন্ট অনুমতি ব্যতিত কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Design & Developed BY ThemesBazar.Com