রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫২ পূর্বাহ্ন
চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি: দুটি পা-ই অচল। চলাচলের একমাত্র সম্বল একটি হুইলচেয়ার। সেই হুইলচেয়ারে ভর করেই বছরের পর বছর কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশী ইউনিয়নের বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্যাণ কুমার দেব। তবে বর্ষা এলেই তাঁর শিক্ষকতার জীবন নেমে আসে চরম দুর্ভোগে। কাদা-পানি, ভাঙাচোরা রাস্তা আর ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ পেরিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে পৌঁছানো তাঁর জন্য যেন এক কঠিন জীবনসংগ্রাম।
অভিজ্ঞ ও দক্ষ এই শিক্ষক ১৯৯৯ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ২০১৩ সালে বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজ মেধা, দক্ষতা ও আন্তরিকতায় শিক্ষকদের মাঝে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন। ইংরেজি বিষয়ে তিনি দক্ষ ‘মাস্টার ট্রেইনার’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। চুনারুঘাট উপজেলার প্রায় সাড়ে সাতশ শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে তিনি একজন বিনয়ী ও আদর্শ শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু ২০১৮ সালে একটি দুর্ঘটনায় ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। দীর্ঘদিন সিআরপিতে চিকিৎসা নেওয়ার পর প্রাণে বেঁচে ফিরলেও হারিয়ে ফেলেন দুই পায়ে হাঁটার সক্ষমতা। এরপর থেকে হুইলচেয়ারই হয়ে ওঠে তাঁর চলার একমাত্র অবলম্বন।
বর্তমানে তিনি চুনারুঘাট উপজেলার আহমেদাবাদ ইউনিয়নের রাজার বাজার এলাকায় নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন। বাড়ি থেকে কর্মস্থল বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। সাধারণ মানুষের জন্যও যে পথ বর্ষায় দুর্ভোগের, একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষের জন্য সেই পথ কতটা কঠিন—তা চোখে না দেখলে বোঝা কঠিন।
বর্ষা মৌসুমে কাঁচা রাস্তা কাদা-পানিতে পরিণত হয়। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও পানি জমে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ একটি ব্রিজ। হুইলচেয়ারে বসে এসব পথ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিদিনই তাঁকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে চলতে হয়। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৬ হাজার টাকা খরচ করে একজন সহকারীও সঙ্গে রাখতে হয় তাঁকে।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও যাতায়াতের এমন দুর্ভোগও তাঁকে শিক্ষকতা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিয়মিত বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে চলেছেন তিনি। তবে টানা বৃষ্টি, কাদা-পানি ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ এখন তাঁর জন্য শুধু শারীরিক নয়, মানসিক যন্ত্রণারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষকরা বলছেন, একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকের এমন কষ্ট মেনে নেওয়া মানবিক নয়। তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করে বাড়ির কাছাকাছি কোনো বিদ্যালয়ে দ্রুত পদায়ন করা হলে একদিকে যেমন তাঁর দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা শিক্ষার্থীদের আরও ভালোভাবে কাজে লাগবে।
কল্যাণ কুমার দেবের শিক্ষকতার প্রতি এই অদম্য নিষ্ঠাকে সম্মান জানিয়ে তাঁর কষ্ট লাঘবে দ্রুত মানবিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক সমাজ। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এই শিক্ষককে বর্ষার কাদা-পানি ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট থেকে দ্রুত মুক্তি দেবেন।